বাজাজের ১০০ বছর: স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে বিশ্বমঞ্চে উত্থান


প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শুভেচ্ছা শতবর্ষ পূর্তিতে

  • বাজার মূলধনের বিচারে ১৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অন্যতম বৃহৎ ভারতীয় কনগ্লোমারেট বাজাজ গ্রুপ, অটোমোবাইল, আর্থিক পরিষেবা, কনজিউমার ইলেকট্রিক্যালস ও ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে দেশের প্রতি তিনটি পরিবারের মধ্যে একটির কাছে পৌঁছে গিয়েছে।
  • বিশ্বাসের শতবর্ষ: স্বাধীনতা সংগ্রামী, সমাজসংস্কারক, শিল্পপতি ও মহাত্মা গান্ধীর ‘পঞ্চম পুত্র’ হিসেবে পরিচিত জামনালাল বাজাজ ১৯২৬ সালে মুম্বইয়ে (তৎকালীন বম্বে) বাজাজ গ্রুপের প্রথম অফিস প্রতিষ্ঠা করেন। ১২ মে, ২০২৬: ভারতের অন্যতম প্রাচীন পারিবারিক ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এবং বাজার মূলধনের বিচারে দেশের অন্যতম বৃহৎ কনগ্লোমারেট বাজাজ গ্রুপ সম্প্রতি ব্যবসায়িক যাত্রার ১০০ বছর পূর্তি উদযাপন করল। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি এই মাইলফলককে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে বিশ্ব অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠার যাত্রার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

১৯২৬ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামী, সমাজসংস্কারক, শিল্পপতি ও সমাজসেবী জামনালাল বাজাজ মুম্বইয়ে বাজাজ গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন। মহাত্মা গান্ধী তাঁকে নিজের ‘পঞ্চম পুত্র’ বলে মনে করতেন। বর্তমানে বাজাজ গ্রুপ দেশের প্রতি তিনটি পরিবারের মধ্যে একটিকে পরিষেবা দিচ্ছে এবং ১ লক্ষ ৩০ হাজারেরও বেশি কর্মী নিয়োজিত রয়েছে এই গোষ্ঠীতে।

১০০-রও বেশি সংস্থা, ১০০-রও বেশি দেশে রফতানি এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা ক্ষেত্রে আসন্ন প্রবেশের মাধ্যমে বাজাজ গ্রুপ অটোমোবাইল, আর্থিক পরিষেবা, কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভারতের অন্যতম বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলির মধ্যে রয়েছে বাজাজ অটো, বাজাজ ফিনসার্ভ, বাজাজ হোল্ডিংস অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, বাজাজ ফাইন্যান্স, বাজাজ হাউজিং ফাইন্যান্স, বাজাজ ইলেকট্রিক্যালস এবং মুকন্দ।

বাজাজ পরিবারের উদ্দেশে পাঠানো বার্তায় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন:
“বাজাজ গ্রুপের শতবর্ষ উপলক্ষে আমি এই ঐতিহাসিক মাইলফলকের সঙ্গে যুক্ত সকলকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। কোনও প্রতিষ্ঠানের জন্য ১০০ বছরের যাত্রা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি শুধু দীর্ঘস্থায়িত্ব নয়, সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে অবদান এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রাসঙ্গিক থাকার প্রতিফলন।

শ্রী জামনালাল বাজাজের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বাজাজ গ্রুপ ভারতের শিল্প ও অর্থনৈতিক বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ের সাক্ষী থেকেছে। আজ এটি এক বহুমুখী সংস্থায় পরিণত হয়েছে, যার কার্যক্রম বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত এবং যা ভারত ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের গ্রাহকদের পরিষেবা দিচ্ছে।

দশকের পর দশক ধরে বাজাজ গ্রুপ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্ভাবন এবং সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই ধরনের মাইলফলক আমাদের অতীতের অবদান স্মরণ করার পাশাপাশি উন্নয়ন, স্থায়িত্ব এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রগতির প্রতি নতুন করে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার সুযোগ দেয়।

ভারত এখন উৎপাদন, উদ্ভাবন ও বিশ্ব প্রতিযোগিতার নতুন আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। বাজাজ গ্রুপের মতো গভীর শিকড় ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলির ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাজাজ গ্রুপের সকলকে আবারও শুভেচ্ছা। আমি নিশ্চিত, আগামী বছরগুলি আরও অগ্রগতি ও জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের সাক্ষী হবে।”

যুব দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান, শিশু স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে বাজাজ গ্রুপের সামাজিক উদ্যোগ ইতিমধ্যেই ১ কোটিরও বেশি মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

মুম্বইয়ের ন্যাশনাল স্পোর্টস ক্লাব অফ ইন্ডিয়ায় অনুষ্ঠিত শতবর্ষ উদযাপনে উপস্থিত ছিলেন বাজাজ পরিবারের সদস্যরা, শিল্পজগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, কেন্দ্র ও রাজ্যের মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, সেলিব্রিটি এবং সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা। অনুষ্ঠানে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে পরিবারের ভূমিকা থেকে শুরু করে ট্রেডিং থেকে ম্যানুফ্যাকচারিং ও আর্থিক পরিষেবায় উত্তরণ এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দেওয়ার যাত্রাপথ তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বাজাজ পরিবারের বক্তব্য, গ্র্যামি পুরস্কারপ্রাপ্ত সুরকার রিকি কেজ ও তাঁর দলের বিশেষ সঙ্গীত পরিবেশন, রাজকুমার হিরানি পরিচালিত জামনালাল বাজাজ ও মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘কথনি করনি একসি’-র প্রদর্শন এবং ‘১০০ ইয়ার্স অফ বাজাজ’ লোগোর উন্মোচন।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বাজাজ অটোর চেয়ারম্যান নিরাজ বাজাজ বলেন:
“আমাদের পরিবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর শুভেচ্ছা ও উৎসাহব্যঞ্জক বার্তার জন্য কৃতজ্ঞ। বাজাজের গল্প এবং ভারতের গল্প কখনও আলাদা ছিল না। ভারতের আত্মনির্ভরতার যাত্রা আজ শুরু হয়নি। প্রায় একশো বছর আগে কিছু দূরদর্শী ভারতীয় বিশ্বাস করেছিলেন যে ভারতকে নিজের জন্য তৈরি করতে হবে, উৎপাদন করতে হবে এবং নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। সেই পথপ্রদর্শকদের মধ্যে একজন ছিলেন আমাদের প্রতিষ্ঠাতা জামনালালজি। ‘ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণ’— এই দর্শনই প্রজন্মের পর প্রজন্ম আমাদের পথ দেখিয়েছে। তাঁর স্ত্রী জানকীদেবী বাজাজ ছিলেন ভারতের প্রথম মহিলা পদ্মবিভূষণ প্রাপক। জামনালালজির দর্শনকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর পুত্র কমলনয়ন বাজাজ ও রামকৃষ্ণ বাজাজ, যাঁদের শৈশব কেটেছে মহাত্মা গান্ধীর সান্নিধ্যে। পরে রাহুল বাজাজ একটি মানবিক অথচ ফলমুখী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী অথচ সৎ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। শিল্প ও সক্ষমতা যতই বৃদ্ধি পাক না কেন, একটি ভাবনা সবসময় স্থির থেকেছে— ‘ভারতে তৈরি করো, ভারতের জন্য তৈরি করো এবং ভারতকে গড়ে তোলো।’”

বাজাজ অটোর ম্যানেজিং ডিরেক্টর রাজীব বাজাজ বলেন:
“আমরা যা বলি এবং যা করি, তা যেন সবসময় এক হয়। সম্ভবত সেই কারণেই বাজাজের যাত্রা শুধুমাত্র বৃদ্ধির গল্প হয়ে ওঠেনি, এটি বিশ্বাসের গল্পে পরিণত হয়েছে। আজ বাজাজ অটো শুধু ভারতের অন্যতম বৃহৎ দু’চাকা প্রস্তুতকারক নয়, বিশ্বে শীর্ষ তিনের মধ্যেও রয়েছে। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০০-রও বেশি দেশে আমাদের গাড়ি বিক্রি হয়। পালসার ব্র্যান্ড আজ বিশ্বমানের ব্র্যান্ডগুলির সঙ্গে সমানতালে প্রতিযোগিতা করছে। KTM-এর মতো অস্ট্রিয়ার আইকনিক মোটরসাইকেল সংস্থার সঙ্গে আমাদের অংশীদারিত্ব শুধুমাত্র ব্যবসায়িক চুক্তি ছিল না। এটি প্রমাণ করেছে যে ভারতীয় সংস্থা শুধু অনুসরণকারী নয়, বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের সহ-নির্মাতাও হতে পারে। আজকের ভারত শুধু অংশগ্রহণ করছে না, বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতাও করছে।”

বাজাজ ইন্টিগ্রেটেড হেলথ সিস্টেমের সিইও নিরব বাজাজ বলেন:
“জামনালালজি বিশ্বাস করতেন ব্যবসা কখনও সমাজ থেকে আলাদা নয়। তিনি বলতেন, ব্যবসার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত দরিদ্র মানুষের উপকার করা। আমাদের পরিবারে আমরা প্রায়ই বলি— সমাজ যেন লাভ থেকেই লাভবান হয়। সেই ভাবনাই নিশ্চিত করেছে যে উন্নয়নের সুফল সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষের কাছেও পৌঁছায়। ‘বাজাজ বিয়ন্ড’, আমাদের CSR উদ্যোগ, শতবর্ষের সেই দর্শনেরই পরবর্তী অধ্যায়। শিক্ষা, জীবিকা ও স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে আগামী পাঁচ বছরে ২ কোটিরও বেশি যুবকের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলাই আমাদের লক্ষ্য। কারণ প্রথম ১০০ বছর যদি প্রতিষ্ঠান গড়ার সময় হয়ে থাকে, তাহলে আগামী ১০০ বছর হবে ইকোসিস্টেম গড়ার সময়।”

বাজাজ ফিনসার্ভের চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর সঞ্জীব বাজাজ বলেন:
“আমার বাবা রাহুল বাজাজ প্রায়ই বলতেন— আমি ভারতের বৈচিত্র্য এবং উদ্যমী যুবসমাজের ওপর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। ভারতের আগামী অধ্যায় রচিত হবে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং সর্বোপরি যুবশক্তির দ্বারা। বাজাজে আমরা AI-কে শুধু প্রযুক্তিগত প্রবণতা হিসেবে দেখি না; আমরা এটিকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে আরও শক্তিশালী করার হাতিয়ার হিসেবে দেখি। কারণ অর্থনৈতিক পরিষেবার সুযোগ মানেই সম্ভাবনার সুযোগ। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে আমরা আমাদের ব্যবসাকে এই দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখেছি— এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে, যা আশা, স্বাধীনতা ও উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আমরা বিশ্বাস করি, যখন সম্ভাবনাকে মঞ্চ দেওয়া হয়, তখন পুরো দেশ এগিয়ে যায়।”

বাজাজ ইলেকট্রিক্যালসের চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর শেখর বাজাজ বলেন:
“জামনালালজির কাজ সামাজিক সমতা, নারী ও শিশুদের শিক্ষা, গ্রামীণ উন্নয়ন, খাদি প্রচার, পর্দাপ্রথা, পণপ্রথা ও বাল্যবিবাহের বিরোধিতা এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্যে বিস্তৃত ছিল। সাফল্য কি শুধুই সংখ্যা ও আকারে মাপা উচিত? নাকি মানুষের জীবনে প্রভাব, মূল্যবোধ এবং সমাজকে শক্তিশালী করার ক্ষমতায়? বাজাজের আগামী ১০০ বছরে এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে আমরা কেমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চাই।”

Tagged:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *