প্রবীণদের নিয়ে মণিপাল হাসপাতাল কলকাতার স্পোর্টস সামিট

  • যেখানে বয়স পিছনে সরে গিয়ে খেলাধুলার আনন্দই হয়ে উঠল দিনের মূল আকর্ষণ


কলকাতা, ২১ আগস্ট ২০২৬: বয়স যখন পিছনে সরে যায় এবং খেলাধুলার সেই চেনা আনন্দ যখন সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন একটি দিন হয়ে ওঠে হাসি, বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা, বন্ধুত্ব এবং অংশগ্রহণের উৎসবে ভরা। এই ভাবনাকেই সামনে রেখে আজ কলকাতায় সিনিয়র সিটিজেনস স্পোর্টস সামিট ২০২৬-এর আয়োজন করল মণিপাল হাসপাতাল কলকাতা। সক্রিয় বার্ধক্যকে উৎসাহিত করা এবং প্রবীণ নাগরিকদের শারীরিকভাবে সক্রিয়, মানসিকভাবে সচেতন ও সামাজিকভাবে যুক্ত থাকার বার্তা দেওয়াই ছিল এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।


সামিটে ১০০-রও বেশি প্রবীণ নাগরিক উৎসাহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন। দাবা, ক্যারম, মার্বেল ও চামচ দৌড়, মিউজিক্যাল চেয়ার, ব্রেন টিজার, বানান প্রতিযোগিতা-সহ নানা ধরনের মজার ইনডোর গেমে তাঁরা অংশ নেন। কোথাও দেখা গেছে কৌশল ও বুদ্ধির পরীক্ষা, কোথাও স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগের চ্যালেঞ্জ, আবার কোথাও গতি ও খেলাধুলার উৎসাহ। সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানস্থল পরিণত হয়েছিল সুস্থতা, বন্ধুত্ব এবং আনন্দের এক প্রাণবন্ত মিলনস্থলে। ‘কিপ লাইফ ইন প্লে!’ ভাবনাকে সামনে রেখে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান দেখিয়ে দিল, জীবনের প্রতিটি বয়সেই সক্রিয় থাকা এবং আনন্দের সঙ্গে যুক্ত থাকা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে মণিপাল হাসপাতাল কলকাতার বিভিন্ন শাখার বিশিষ্ট চিকিৎসকরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ডা. রথিজিৎ মিত্র, ক্লিনিক্যাল লিড – নিউরোসার্জারি, মণিপাল হাসপাতাল ধাকুরিয়া; ডা. সুশ্রুত বন্দ্যোপাধ্যায়, হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট – আইসিইউ অ্যান্ড ক্রিটিক্যাল কেয়ার, মণিপাল হাসপাতাল ব্রডওয়ে; ডা. সোহম মণ্ডল, কনসালট্যান্ট – অর্থোপেডিক্স অ্যান্ড জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট সার্জন, মণিপাল হাসপাতাল ব্রডওয়ে; ডা. অংশু সেন, সিনিয়র কনসালট্যান্ট – নিউরোলজি, মণিপাল হাসপাতাল সল্ট লেক; ডা. পি. এস. ব্যানার্জি, সিনিয়র কনসালট্যান্ট – কার্ডিওলজি, মণিপাল হাসপাতাল সল্ট লেক; ডা. সুতনু হাজরা, সিনিয়র কনসালট্যান্ট – অর্থোপেডিক্স, মণিপাল হাসপাতাল মুকুন্দপুর; ডা. সৌরভ দত্ত, ডিরেক্টর, মণিপাল কমপ্রিহেনসিভ ক্যানসার কেয়ার সেন্টার, ব্রডওয়ে এবং মুকুন্দপুর ক্লাস্টার, কলকাতা; ডা. দিলীপ কুমার, ডিরেক্টর অ্যান্ড সিনিয়র কনসালট্যান্ট – কার্ডিওলজি, মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাস; ডা. হর্ষ জৈন, সিনিয়র কনসালট্যান্ট – নিউরোসার্জারি, মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাস; ডা. সৌরভ চ্যাটার্জি, কনসালট্যান্ট – স্পাইন সার্জন, মণিপাল হাসপাতাল সল্ট লেক; ডা. জয়ন্ত দাস, কনসালট্যান্ট – ভাসকুলার সার্জারি বিভাগ, মণিপাল হাসপাতাল ব্রডওয়ে এবং ডা. নিকেত অরোরা, সিনিয়র কনসালট্যান্ট – কার্ডিওভাসকুলার অ্যান্ড থোরাসিক সার্জারি, মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাস। উদ্বোধন এবং পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে চিকিৎসকেরা অংশ নেন এবং প্রবীণ অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁরা সুস্থ বার্ধক্যের জন্য শরীর ও মনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ এবং সামগ্রিক সুস্থতার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত টেবিল টেনিস খেলোয়াড়, ২০০৬ সালের অর্জুন পুরস্কারপ্রাপ্ত সুব্রত সাহা। তাঁর দীর্ঘ ক্রীড়াজীবনে রয়েছে ২০০৬ ও ২০১০ সালের কমনওয়েলথ গেমসে সোনার পদক, ২০০৬ সালের জাতীয় পুরুষ একক চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা এবং ২০০২ ও ২০০৪ সালের SAF Games-এ সোনার পদক। তিনি কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়নশিপেও একাধিক পদক জিতেছেন এবং বর্তমানে ভারতীয় জাতীয় টেবিল টেনিস দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর উপস্থিতি অনুষ্ঠানে বিশেষ ক্রীড়ার আবহ তৈরি করে এবং বয়সকে পিছনে রেখে শরীরচর্চা, সুস্থতা ও খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য অংশগ্রহণকারীদের উৎসাহিত করে।
সামিটে কলকাতার কয়েকজন প্রবীণ সফল ব্যক্তি ও উদ্যোক্তাকে বিশেষভাবে সম্মান জানানো হয়। তাঁদের কাজ, আগ্রহ এবং সমাজের প্রতি অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মান প্রদান করা হয়। সম্মানিতদের মধ্যে ছিলেন ডা. অরুণোদয় মণ্ডল, ২০২০ সালের পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত চিকিৎসক; রমেশ চন্দ্রন, পরিবেশবিদ ও ভিনিশার প্রতিষ্ঠাতা; এবং মধুমিতা সেন, উদ্যোক্তা ও অদ্বয়া উইভস-এর মালিক।


প্রবীণ নাগরিকদের নিরাপদে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার গুরুত্বের উপর জোর দিয়ে ডা. সুশ্রুত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “সুস্থভাবে বার্ধক্যে পৌঁছনোর অর্থ হল জীবনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকা এবং একইসঙ্গে নিজের শারীরিক পরিস্থিতি ও স্বাস্থ্যের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন থাকা। নিয়মিত শারীরিক ক্রিয়াকলাপ, সামাজিক যোগাযোগ এবং ইতিবাচক মানসিকতা সার্বিক সুস্থতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। একইসঙ্গে, শারীরিক ক্রিয়াকলাপে অংশ নেওয়ার সময় প্রবীণদের নিজেদের শারীরিক সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। আজ অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেখা গিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে একটি সুন্দর উদাহরণ—কীভাবে শরীরচর্চা, আনন্দ ও পারস্পরিক সান্নিধ্য বার্ধক্যকে আরও সক্রিয় ও আনন্দময় করে তুলতে পারে।”
হৃদ্‌যন্ত্রের সুস্থতা এবং নিয়মিত শারীরিক ক্রিয়াকলাপের গুরুত্ব তুলে ধরে ডা. পি. এস. বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হৃদ্‌যন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হল নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা। ব্যক্তির শারীরিক সক্ষমতা ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিয়মিত শারীরিক ক্রিয়াকলাপ সহনশক্তি এবং দৈনন্দিন কাজ করার সামগ্রিক সক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। সিনিয়র সিটিজেনস’ স্পোর্টস সামিটের মতো উদ্যোগ প্রবীণদের আনন্দদায়ক উপায়ে সক্রিয় থাকার সুযোগ করে দেয় এবং একইসঙ্গে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার গুরুত্বও মনে করিয়ে দেয়।”
মেরুদণ্ডের সুস্থতা এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে চলাফেরার সক্ষমতা বজায় রাখার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে ডা. সৌরভ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেরুদণ্ডের সুস্থতা বজায় রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ শরীরে শক্ত হয়ে যাওয়া, পেশির দুর্বলতা এবং ভারসাম্যজনিত সমস্যা চলাফেরা ও স্বাধীনভাবে দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। নিয়মিত শরীরচর্চা, উপযুক্ত শক্তিবর্ধক ব্যায়াম এবং সঠিক অঙ্গভঙ্গি বজায় রাখা প্রবীণদের সচল ও আত্মবিশ্বাসী থাকতে সাহায্য করতে পারে। এই ধরনের উদ্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শারীরিক ক্রিয়াকলাপ সবসময় কঠোর বা অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য হতে হবে এমন নয়; আনন্দদায়ক খেলা, সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক নড়াচড়াও শরীরকে সচল ও সক্রিয় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।”
রক্তনালীর সুস্থতা এবং শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার গুরুত্বের উপর জোর দিয়ে ডা. জয়ন্ত দাস বলেন, “সুস্থভাবে বার্ধক্য কাটানোর ক্ষেত্রে রক্তনালীর সুস্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নিয়মিত শারীরিক ক্রিয়াকলাপ রক্তসঞ্চালন ও সার্বিক হৃদ্‌যন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে। বয়সের কারণে প্রবীণদের নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার পরিবর্তে তাঁদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও স্বাচ্ছন্দ্যদায়ক উপায়ে সক্রিয় থাকার জন্য উৎসাহিত করা উচিত। সিনিয়র সিটিজেনস’ স্পোর্টস সামিট আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে সক্রিয় থাকা আনন্দদায়ক, সামাজিক এবং উৎসাহব্যঞ্জকও হতে পারে। এই ধরনের উদ্যোগ প্রবীণদের নিজেদের শরীর ও তাঁদের সামাজিক পরিসরের সঙ্গে আরও সংযুক্ত থাকতে সাহায্য করে।”
প্রবীণ নাগরিকদের হৃদ্‌যন্ত্রের সুস্থতা এবং শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার গুরুত্বের কথা তুলে ধরে ডা. নিকেত অরোরা বলেন, “যে সমস্ত কার্যকলাপ আনন্দ ও জীবনে উদ্দেশ্যবোধ এনে দেয়, বয়স কখনও সেগুলিতে অংশগ্রহণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো উচিত নয়। প্রবীণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে নিয়মিত শারীরিক ক্রিয়াকলাপ, সামাজিক যোগাযোগ এবং আত্মবিশ্বাস সার্বিক জীবনযাত্রার মানের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও যেকোনও ধরনের শারীরিক কার্যকলাপের আগে ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থা বিবেচনা করা জরুরি, তবুও এই ধরনের উদ্যোগ এমন একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করে যেখানে প্রবীণরা সক্রিয় থাকতে, নিজেদের সক্ষমতাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে এবং বয়সজনিত সীমাবদ্ধতার পরিবর্তে তাঁরা কী কী করতে পারেন, তা উদ্‌যাপন করতে পারেন।”
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে মণিপাল হাসপাতালের বিভিন্ন শাখার চিকিৎসকেরা বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। এই আয়োজন শুধু পুরস্কার জয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং অংশগ্রহণ, চেষ্টা, উৎসাহ এবং নতুন কিছু করার আগ্রহকেও সমানভাবে উদযাপন করা হয়।
সিনিয়র সিটিজেনস স্পোর্টস সামিট শেষ হয় প্রবল উৎসাহ ও আনন্দের মধ্য দিয়ে। অনুষ্ঠানটি শুধু বিজয়ী এবং স্মৃতি তৈরি করেনি, বরং মনে করিয়ে দিয়েছে যে বয়স কখনও চলাফেরা, অংশগ্রহণ, বন্ধুত্ব বা আনন্দের পথে বাধা হওয়া উচিত নয়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে মণিপাল হাসপাতাল কলকাতা আরও সক্রিয়, সুস্থ এবং আনন্দময় বার্ধক্যের বার্তা তুলে ধরল এবং প্রবীণ নাগরিকদের জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে ‘কিপ লাইফ ইন প্লে!’-এর চেতনায় এগিয়ে চলার উৎসাহ দিল।

Tagged:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *