পশ্চিমবঙ্গের জনস্বাস্থ্য ও কারিগরী দপ্তরে কর্মরত ঠিকাদার কর্মীদের সংগঠন
AII BENGAL PHE CONTRACTORS ASSOCIATION (CIVIL)। গতকাল কলকাতার ডালহৌসি ক্লাবে তাঁরা একটি সাংবাদিক সম্মেলনে যেটা জানালেন সেটা এখানে তুলে ধরা হল –
আমরা অনেকেই দীর্ঘ প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ বছর কাজ করছি। আমাদের এই ৩৫ থেকে ৪০ বছরের অভিজ্ঞতায় এরকম জীবন-মরণ এক হয়ে যাওয়া পরিস্থিতি কখনও তৈরী হয়নি। হয়নি, কারণ ১৯-২০ অর্থবর্ষের আগে পর্যন্ত এই দপ্তরে বার্ষিক কাজের বরাদ্দ থাকতো সর্বোচ্চ ১০০০-১২০০ কোটি টাকা। সেই অনুযায়ী বাংলার সমস্ত ডিভিশন যা কাজ করাতো, তাতে আমরা সেই কাজ সম্পাদন করে দুবেলা দুমুঠো শান্তির গ্রাসাচ্ছাদন করেই কাটাতাম।
কিন্তু কোটালের বানের মতো ১৯-২০ অর্থবর্ষের আগস্ট মাসে কেন্দ্রীয় সরকার সারা ভারতবর্ষে জল জীবন মিশন বা হর ঘর জল প্রকল্প ঘোষণা করে ২,০৮,৬৫২ কোটি টাকা বরাদ্দসহ পরবর্তী ২৩-২৪ অর্থবর্ষ পর্যন্ত প্রকল্প সম্পাদনের সময়সীমা ধার্য করে, কেন্দ্র: রাজ্য ৫০:৫০ আনুপাতিক প্রকল্প ব্যয় ধরে।
আমাদের পশ্চিমবঙ্গের জনস্বাস্থ্য কারিগরী দপ্তর কেন্দ্রীয় সরকারের সেই লক্ষ্য পূরণে সারা রাজ্যব্যাপী ৫৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রকের অনুমোদন ক্রমে তড়িঘড়ি কাজ শুরু করে সারা বাংলাব্যাপী।
প্রথম পর্যায় ১৯-২০ অর্থবর্ষের ঠিক আগে আগেই যে সমস্ত জল প্রকল্পগুলি শেষ হয়েছিল, সেই সমস্ত প্রকল্পে বাড়ি বাড়ি জল সংযোগের কাজ শুরু হয় Retrofitting নাম দিয়ে।
দ্বিতীয় পর্যায় ১৯-২০ অর্থবর্ষের কয়েক বছর আগে যে প্রকল্পগুলি শেষ হয়েছিল কিন্তু রুগ্ন হয়ে গিয়েছিল সেই প্রকল্পগুলি কিছু পরিবর্তন পরিবর্ধন করে Augmentation নাম দিয়ে বাড়ি বাড়ি জল সংযোগ শুরু হয়।
তৃতীয় পর্যায় যে সমস্ত এলাকায় কোন পরিকাঠামো ছিলনা একদমই, সেখানে নব কলেবরে কাজ শুরু হয়, New scheme নাম দিয়ে। এই তৃতীয় পর্যায়ের কাজ হতেই সময় অনেক বেশি লাগছে প্রধানত জমি না পাওয়ার কারণে।
প্রকল্প শুরুর সাথে পশ্চিমবঙ্গের টাকা খরচের এবং কেন্দ্র রাজ্য আনুপাতিক হার নিম্নরূপ-

এবং এই তালিকাভুক্ত ১০১০ কোটি টাকা কেন্দ্র আগস্ট ২০২৪ পাঠায় শেষ বারের মতো।
এখানে বলে রাখা ভালো যদিও উক্ত প্রকল্প ২৩-২৪ অর্থবর্ষ অর্থাৎ ৩১/৩/২০২৪ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা তথাপি কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রক ২৩-২৪ অর্থবর্ষ পর্যন্ত ১,৮৫,৯৫৮ কোটি টাকা খরচ করার পর বকেয়া ২২,৬৯৪ কোটি টাকা খরচ করার লক্ষ্যে ৩১/৩/২০২৫ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়সীমা বর্ধিত করে, ৫-৪-২০২৪ তারিখে নোটিশ জারি করে।
অথচ কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রকের অনুমোদিত ৫৬ হাজার কোটি বাংলার জন্য বরাদ্দের মধ্যে ২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১৩৩১৩.৫৪ কোটি টাকা দিয়ে কেন্দ্র টাকা বন্ধ করে দেয়। যেখানে টাকা দেওয়ার নির্ধারিত পরিমাণ ছিল ২৮ হাজার কোটি, সেখানে অর্ধেকেরও কম টাকা দিয়ে থমকে গিয়েছে কেন্দ্র। আবার ২৪-২৫ এর শেষ লগ্নে কেন্দ্রীয় বাজেটে জলশক্তি মন্ত্রক এই জল জীবন মিশন বা হর ঘর জল প্রকল্প ২০২৮ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করেন, ২৫-২৬ অর্ধবর্ষের জন্য ৬৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দ সহ।
এই পরিস্থিতিতে আমাদের রাজ্য সরকারও ২৫-২৬ অর্থবর্ষের বাজেট বরাদ্দ করেন। ২০২৪ আগস্ট থেকে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ না আসায় রাজ্য সরকার এই কাজের ধারাবাহিকতা বহাল রাখতে ২৫-২৬ অর্থবর্ষের জন্য বরাদ্দ ঘোষণা করে ১১৬৩৬ কোটি টাকা।
২৫-২৬ অর্ধবর্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমরা বাংলার ঠিকাদাররা জীবন মরণ লড়াইয়ে সম্মুখীন। আমরা সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনা মোতাবেক সারা বাংলার ১কোটি ৭৩ লক্ষ্য বাড়ির মধ্যে প্রায় ১কোটি বাড়িতেই ইতিমধ্যেই জল সংযোগের কাজ সম্পাদন করেছি তবুও সারা বাংলায় JJM প্রকল্পে জমাকৃত বিলের টাকার পরিমাণ প্রায় ৫০০০ কোটি টাকা।
এই কাজ ধরতে (Tender participation) গিয়ে আমাদের Tender Clause ছিল বিশ্বসতা। যে Bonafidity দিয়ে আমরা কাজ ধরেছি, সমাজ সংসারে সেই Bonafidity ই আজ বিপন্ন। মহাজনদের নির্ভরশীলতা তলানিতে, Bank আর বিশ্বাস করতে পারছে না, যেকোনো সময় বিষয় সম্পত্তি হস্তুগত করার পদ্ধতি প্রয়োগ করবে। লেবার সরদার সহ সমস্ত শ্রমিক, যাদের ওপর আস্থা রেখে আমরা কোটি কোটি টাকা মূল্যের কাজ সম্পাদনের সাহস রাখতাম, সেই শ্রমিকরা আজ আর আমাদের কোনো কথা মানছে না। তারা দিশেহারা/মরিয়া হয়ে উঠেছে। যেকোনো মুহূর্তে আমরা ঘর-সংসার সহ আক্রান্ত হতে পারি, লেবার সর্দাররা আক্রান্ত হতে পারে অথবা তাদের স্ত্রী সন্তান সহ কোনো জীবনহানি কর ঘটনা ঘটে যাওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা।
উপরিল্লিখিত সমগ্র বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করলে এটা অনুধাবন করতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় না, যে আমরা ঠিকাদাররা এবং আমাদের অনুসঙ্গীরাও নিদারুন সংকটের মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করছি। অত্যন্ত দুঃখের ও লজ্জার বিষয় যে আমরা আমাদের পরিবার পরিজনদের নিত্যপ্রয়োজনীয় অভাব (দৈনন্দিন জীবনযাপনের চাহিদা, সন্তানের শিক্ষা, নিয়মিত চিকিৎসা ইত্যাদি) মোচন করতে ব্যর্থ হচ্ছি এবং সেই কারণে আমাদের পরিবার পরিজনরা প্রশাসনিক বোধের অভাবে সরকার প্রসঙ্গে বিরূপ ধারণা পোষণ করছে। এক্ষেত্রে আমরা এবং আমাদের অনুসঙ্গীরা তাদের আশ্বস্ত করতেও ব্যর্থ হচ্ছি, কারন দীর্ঘদিনের অভাব-অনটন, ধার-দেনার এই জটিল পরিস্থিতিতে আমাদের পরিবার-পরিজনরাও আর আস্থা রাখতে পারছে না।
বলাবাহুল্য আমরা এই সংকট মোচণের তাগিদে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে, এমনকি মন্ত্রী পর্যায়েও বিভিন্ন সময়ে আলাপ-আলোচনা করেছি।
সারা পশ্চিমবাংলার এক কোটি ৭৩ লক্ষ বাড়িতে জল বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছানোর পরিকল্পনা। আমরা আজ পর্যন্ত প্রায় এক কোটি বাড়িতে জল পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে পেরেছি।
এই জল পৌঁছানোর কাজে ডে টুডে অপারেশন ও মেনটেনেন্সের কাজ, এই দপ্তরের হৃদস্পন্দন।
সেই কাজেরও আমরা প্রায় দু বছরের মধ্যে সামান্য ১৫ থেকে ৩০% পেমেন্ট পেয়েছি। বাকি পেমেন্টের অভাবে সমস্ত জল সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় অচল হবার পথে।
বারবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার পরেও যদি এই পরিষেবা ব্যাহত হয় সহ নাগরিকরা কোনরকম অসুবিধার সম্মুখীন হন তার দায় কোনোভাবেই এই ঠিকাদারদের দেওয়া যাবে না।
গত ২৩-২৪ ২৪-২৫ এবং ২৫-২৬ আমরা পশ্চিমবাংলার প্রচন্ড খরার সময় প্রত্যন্ত এলাকায় বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ করার পরেও আজকে আমরা নিরন্ন।
২০২৩ সালের পঞ্চায়েত ইলেকশন ২০২৪ সালের লোকসভা ইলেকশন প্যারা মিলিটারি ফোর্স এর লজিস্টিক সার্ভিস সঠিকভাবে করার পরেও এখনো আমাদের কোনো পেমেন্ট জোটেনি।
মুখ্যমন্ত্রীর জেলা সফর ও অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ মিটিং যেগুলো আমাদের জেলার উন্নয়নের জন্য জন্য খুব উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করে। সেই পেমেন্টও আমরা আজ পর্যন্ত পাইনি।
কিন্তু সংকট নিরসনের পরিবর্তে, বেড়েই চলেছে। আজ আমরা চরম অর্থনৈতিক সংকটে। মহামান্য সরকার দ্বয়ের কাছে আমাদের পাওনা :-
পিএইচই তারিখের হালনাগাদ বকেয়া (ডব্লিউ.বি.)







